নিউইয়র্ক সাবওয়ের চেম্বার ষ্ট্রিট ষ্টেশন থেকে নেমে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই ষ্ট্যাটু অফ লিবার্টি। মূল প্রবেশ দ্বারের সামনে বিশাল পার্ক। সুন্দর গাছপালা পরিবেষ্টিত মনোরম পরিবেশ।

পার্কে প্রবেশ করতেই দুহাত ছড়িয়ে আমাদের রূখে দাঁড়ালেন মোটাসোটা এক কৃশকায় যুবক। সিকিউরিটি কিংবা পুলিশ অফিসারের ন্যায় ইউনিফর্ম জ্যাকেট পরিহিত। মাথায় হ্যাট। বললেন টিকেট প্লিজ।

পাঁচজনের গ্রুপ আমাদের। আমরা বললাম টিকেট তো নিয়ে আসিনি। এখান থেকেই কিনব। 

স্যরি! বেশ কড়া সূরে যুবকটি বলল, আজকের সব টিকেট সকালেই বিক্রি হয়ে গেছে। ভিতরের দরজাটি বন্ধ। ঐদিকে টিকেট ছাড়া যেতে পারবেন না।


ইতিমধ্যে আরো কয়েকজন যাত্রী এলেন। সবাইকে থামিয়ে লোকটি জিজ্ঞেস করতে লাগল টিকেট আছে কীনা। তারপর থামিয়ে টিকেট দেখে ভিতরে যাবার অনুমতি দিল।


পার্কের ভিতরেই বাদাম বিক্রি করছেন এক বাঙ্গালী ভাই। এখানকার বাদাম অবশ্য একটু ভিন্ন ষ্টাইলে। কড়া মিষ্টির সাথে বিভিন্ন ফ্লেভার দিয়ে মচমচে ভাজা বাদাম। গরম পরিবেশন করছেন। 


আমাদের পথ আগলে দাঁড়ানো সেই যুবকটিকে আমি বললাম, আমাদের টিকেট নেই ঠিক আছে। আমরা টিকেট অফিস থেকে কিনে নেব। যদি আজকের না পাই, কালকেরটা কিনব। আমাদের টিকেট অফিস পর্যন্ত যেতে দিন। 


লোকটি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার! আমার একটা জব আছে। এভাবে টিকেট ছাড়া আমি আপনাদের ভিতরে যেতে দিতে পারি না। টহলরত পুলিশকে দেখিয়ে বলল, ঐ দেখুন, পুলিশও আছে এখানে। টিকেট ছাড়া ভিতরে যেতে চাইলে পুলিশ আটকাবে আপনাদের।  

লোকটির মতিগতি কিছুটা সন্দেহজনক মনে হল। সে সিকিউরিটি হলে আমাদের চেক করতে পারে। কিন্তু টিকেট কিনতে আমরা কাউন্টারে যাব কিন্তু সে আটকাচ্ছে কেন। আমি চেষ্টা করলাম সেই বাদাম বিক্রেতা বাঙ্গালী ভাইয়ের সাথে চোখাচুখি বা  আই কন্টাক্ট করার জন্য। যদি তিনি কোন ইশারা করেন। তাঁর দোকানের মাত্র ৫-৬ হাত সামনেই আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু তিনি আমাদের দিকে তাকালেনই না!

সেই আত্মীয় মনে করেছেন আমি কথা বললে টিকেটও আমি কিনে ফেলব। তারা সেই সুযোগ পাবেন না। তাই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে টিকেট কেনার উপায় কি?

লোকটি বলল, এখান থেকে কেনার কোন উপায় নেই। আর এটা কিনে লাভও নেই। এখানে দিয়ে শুধু যাবেন আর ফেরী দিয়ে ঘুরবেন। কোন আইল্যান্ডে নামার সুযোগ পাবেন না। তারচেয়ে বরং আপনার লাক্সারিয়াস ক্রুজের টিকেট নেন। সেটা আমিই দিতে পারি।

নিউইয়র্কে এটা আমার দ্বিতীয় দিন। দশদিনের ট্যুরে এসেছি বেড়াতে। যে আত্মীয়ের বাসায় এসেছি তিনিই নিয়ে এসেছেন আমাদের। অতিথি হিসাবে আমি বেশি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি না। আমাদের দলের হয়ে সেই লোকটির সাথে কথা বলছেন আমার আত্মীয়। তাকে ডিঙ্গিয়ে আমার কথা বলাটাও বেশ শোভন মনে হচ্ছে না।

তারপর তার কাছ থেকে টিকেট নিলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে তার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিলেন। ক্রুজের মধ্যে নাচ গান। সাথে পানীয়র সুবিধা। লাইভ কমেন্ট্রি। সাতটি আইল্যান্ড ঘুরে দেখাবে সেই ক্রুজ। যেখানে খুশি নামা যাবে। আবার পরের ক্রুজে উঠাও যাবে।
টিকেটের দাম? এখানে যা তারচেয়ে সামান্য বেশি। কিন্তু যেসব সুবিধা পাচ্ছেন তার মূল্য কয়েকগুণ বেশি।

আমার আত্মীয় কনভিন্স হয়ে গেলেন। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কিনে নিলেন চারটি টিকেট। বাচ্চার টিকেট লাগবে না। ১৪০ ডলার দিয়ে তৎক্ষনাৎ মিলল টিকেট। এবার আমাদের সামনের গেটে যাবার পালা।

কিন্তু প্রথম ধাক্কা মিলল লোকটি যখন আমাদের অন্য পথ ধরিয়ে দিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল আরও তিন চার জন। তাদের দিকে ইঙ্গিত করল। একজন এগিয়ে আসার পর লোকটি তাকে বলল, উনাদের পথ দেখিয়ে বাসে নিয়ে যাও।

ষ্ট্যাচু অব লিবার্টির একদম সামনে এসে আবার বাস কেন? দ্বিতীয় লোকটি আমাদের নিয়ে চলল পথ দেখিয়ে। বিভিন্ন ছোটবড় গলি আর মেইন রাস্তা পেরিয়ে প্রায় পনের মিনিট দূরত্বে আমরা হাঁটলাম। 

সেখানে লোকটি আমাদের দেখিয়ে দিল মাঝারি আকৃতির সাদা রংয়ের একটি কোচ। ভিতরে উঠে দেখলাম সেটি প্রায় পূর্ণ। অন্য যাত্রীদের দেখে বুঝলাম উনারাও ধূর্তদের পাল্লায় পড়েছেন। ঠিক আমাদের মতই!

সেই কোচে তখনও কয়েকটি সিট খালি ছিল। সেগুলোর যাত্রী আসার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হলে আরও প্রায় চল্লিশ মিনিট। তারপর সেই কোচ আমাদের নিয়ে চলল। প্রায় দেড় ঘন্টা পর আমরা এসে পৌঁছালাম উপকূলে।

জায়গাটির নাম নিউ জার্সি। এটা নিউইয়র্কের কাছাকাছি। তবে ভিন্ন অঙ্গরাজ্য। এখান থেকে বিভিন্ন লঞ্চে চড়ে (ক্রুজ নামে পরিচিত) ষ্ট্যাচু অব লিবার্টি এলাকায় নৌবিহারে সময় কাটানোর ভাল ব্যবস্থা আছে। তবে সেগুলো প্রাইভেট এবং খরচ কিছুটা বেশি।  

মনে করুন আপনি বেড়াতে গেছেন সদরঘাট। উদ্দেশ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকায় একটু ঘুরে বেড়াবেন। কিন্তু পড়লেন প্রতারকদের পাল্লায়। তারা এখানে আজ নৌকা নেই, এদিকে যেতে পারবেন না এইসব হাবিজাবি বলে আপনাকে বিভ্রান্ত করল।

তারপর আরও ভাল ব্যবস্থা ও সুবিধার কথা বলে আপনাকে নিয়ে গেল নারায়নগন্জের শীতলক্ষা নদীর তীরে। অত:পর সেখান থেকে আপনাকে আবার নৌকায় করে পাঠাল বুড়িগঙ্গা। 

তবে এক্ষেত্রে বিপদ হল বাংলাদেশী প্রতারকরা টাকা নিয়ে কেটে পড়বে। আপনি টাকাও হারাবেন। ঘুরে দেখার সুযোগও পাবেন না। এখানকার প্রতারকরা অবশ্য সেরকম কিছু করতে পারবে না। আপনাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে অন্য কিছু গছিয়ে দিবে।

আমেরিকাকে আমরা বাইরে থেকে যেরকম দেখি তাতে এই দেশের আইন-শৃঙ্খলা খুবই উচ্চমানের মনে হয়। সেই ধারনা থেকেই এখানেও যে এসব জোচ্চুরি হতে পারে সে চিন্তা করি নাই। 

ষ্ট্যাচু অব লিবার্টির ভিতরে এয়ারপোর্টের ন্যায় সিকিউরিটির ব্যবস্থা। কিন্তু বাইরে এরকম প্রতারকরা আইন-প্রশাসন কিংবা পুলিশের সামনেই বুক ফুলিয়ে পর্যটকদের প্রতারণা করছে। এও কি সম্ভব? 

আমেরিকা বলেই এটা সম্ভব!


বদরুল হোসেন বাবু: ফ্রি-ল্যান্স লেখক ও ব্লগার। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত।