স্কটল্যান্ডের হৃদয়গলে অবস্থিত এডিনবরা শহরটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ‘উত্তরের এথেন্স’ নামে খ্যাত এই শহরটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করে। আজকে আমরা এডিনবরার এমনই কিছু প্রধান আকর্ষণ সম্পর্কে জানবো যা আপনার ভ্রমণ তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত।
১. এডিনবরা ক্যাসল (Edinburgh Castle) – শহরের মুকুটমণি
এডিনবরা শহরের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো এডিনবরা ক্যাসল। একটি বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরির চূড়ায় (ক্যাসল রক) অবস্থিত এই দুর্গটি প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। এখানে আপনি দেখতে পাবেন:
ক্রাউন জুয়েলস অফ স্কটল্যান্ড (স্কটিশ রাজমুকুট, রাজদণ্ড ও তলোয়ার)
স্টোন অফ ডেসটিনি – যেটি শতাব্দী ধরে স্কটিশ ও ব্রিটিশ রাজাদের অভিষেকের সময় ব্যবহৃত হয়েছে
মন্স মেগ – একটি বিশাল কামান যা ১৫শ শতাব্দীর
ন্যাশনাল ওয়ার মিউজিয়াম – স্কটল্যান্ডের সামরিক ইতিহাসের চিত্র
টিপস: প্রতিদিন দুপুর ১টায় ‘ওয়ান ও’ক্লক গান’ ফায়ার করা হয় – এটি দেখতে ভুলবেন না।
২. রয়েল মাইল (Royal Mile) – ইতিহাসের সজীব সড়ক
এডিনবরা ক্যাসল থেকে শুরু হয়ে হোলিরুড প্যালেস পর্যন্ত প্রসারিত প্রায় ১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটিই রয়েল মাইল। এটি আসলে চারটি সংযুক্ত রাস্তা মিলে গঠিত: ক্যাসলহিল, লনমার্কেট, হাই স্ট্রিট এবং ক্যাননগেট।
এখানে যা করবেন:
রাস্তার দুই ধারের স্কটিশ উলের সোয়েটার, হুইস্কি ও হস্তশিল্পের দোকান ঘুরে দেখুন
সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রাল – এডিনবরার প্রধান গির্জা, যার মুকুটের মত সুউচ্চ টাওয়ার
রিয়েল মেরি কিং’স ক্লোজ – ভূগর্ভস্থ একটি প্রাচীন রাস্তা, যেখানে গাইডেড ট্যুর হয়
স্ট্রিট পারফর্মার ও বাস্কারদের অনুষ্ঠান উপভোগ করুন
৩. হোলিরুড প্যালেস (Holyrood Palace) – ব্রিটিশ রাজার সরকারি বাসভবন
রয়েল মাইলের শেষ প্রান্তে অবস্থিত হোলিরুড প্যালেস হল স্কটল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজার সরকারি বাসভবন। যখন রাজা চার্লস এডিনবরায় আসেন, তখন তিনি এখানেই থাকেন।
দর্শনীয় স্থান:
মেরি কুইন অফ স্কটসের কক্ষ – যেখানে রানী মেরি তার ইতালীয় সচিব ডেভিড রিজিওকে হত্যা হতে দেখেছিলেন বলে ইতিহাস বলে
গ্রেট গ্যালারি – এখানে স্কটিশ রাজাদের ৮৯টি চিত্রকর্ম আছে
বড় বড় রাজকীয় উদ্যান (হোলিরুড পার্ক)
সংলগ্নেই আছে আর্থার’স সিট – একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির চূড়া। এটি ট্রেকিংয়ের জন্য দারুণ জায়গা।
৪. আর্থার’স সিট (Arthur’s Seat) – শহরের উপর থেকে অপরূপ দৃশ্য
এডিনবরার সবচেয়ে চমৎকার প্রাকৃতিক আকর্ষণ হলো আর্থার’স সিট। এটি ২৫১ মিটার উচ্চতার একটি পাহাড়। হোলিরুড পার্কের ভেতর এটি অবস্থিত।
কেন যাবেন:
চূড়ায় উঠলে পুরো এডিনবরা শহর, ফার্থ অফ ফোর্থ নদী এবং আশপাশের পাহাড়ের ৩৬০° প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় দৃশ্য অসাধারণ হয়
এটি একটি সহজ-মাঝারি ট্রেক (৪৫-৬০ মিনিট)
সাবধানতা: বাতাস প্রবল থাকতে পারে। আরামদায়ক জুতা পরে যাবেন।
৫. স্কটিশ ন্যাশনাল গ্যালারি (Scottish National Gallery)
শিল্পপ্রেমীদের জন্য স্কটিশ ন্যাশনাল গ্যালারি স্বর্গসমান। প্রুউটিস স্ট্রিটে অবস্থিত এই গ্যালারিতে বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের কাজ আছে।
যেসব শিল্পী কাজ করেছেন এখানে:
বটিচেল্লি, রাফায়েল, তিতিয়ান (ইতালীয় রেনেসাঁ)
রেমব্রান্ট, ভার্মির (ডাচ মাস্টার)
টার্নার, কনস্টেবল, ভ্যান গখ
স্কটিশ শিল্পী যেমন স্যার হেনরি রেবার্ন ও স্যার ডেভিড উইলকি
এক্সট্রা: রয়েল স্কটিশ একাডেমি সংলগ্ন ভবনটিও ঘুরে দেখতে পারেন।
৬. এডিনবরা জলাশয় (Edinburgh Zoo) – ব্রিটেনের একমাত্র পান্ডা সংরক্ষণ কেন্দ্র
এডিনবরা চিড়িয়াখানা ব্রিটেনের একমাত্র চিড়িয়াখানা যেখানে জায়ান্ট পান্ডা আছে। (২০২৩ সালের পর পান্ডা চীনে ফিরে গেলেও এখানে অন্যান্য বিরল প্রাণী আছে)
আকর্ষণসমূহ:
কোয়ালা ও চিম্পাঞ্জি
পেঙ্গুইন প্যারেড – প্রতিদিন পেঙ্গুইনদের কুচকাওয়াজ
বুদংগো গিবন ও সুমাত্রান বাঘ
টিপস: পাহাড়ের উপরে চিড়িয়াখানা, তাই হাঁটার জন্য আরামদায়ক জুতা পরবেন।
৭. দ্য রিয়েল মেরি কিং’স ক্লোজ (The Real Mary King’s Close)
রয়েল মাইলের নিচে একটি লুকানো ভূগর্ভস্থ শহর আছে – মেরি কিং’স ক্লোজ। ১৭শ শতাব্দীর প্লেগ মহামারির সময় এটি সিল করে দেওয়া হয়েছিল।
এখানে যা দেখবেন:
খাঁটি ১৬৪০-এর দশকের রাস্তা, বাড়ি ও দোকান
প্লেগে মৃত এক মেয়ের ‘ভূতের’ গল্প (ট্যুর গাইডদের মাধ্যমে)
এডিনবরার পুরনো জীবনযাত্রার নিদর্শন
লক্ষ্য রাখবেন: এটি শুধুমাত্র গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমে ঘোরানো যায়। আগেই টিকিট কেটে রাখা ভাল।
৮. এডিনবরার উৎসব (Edinburgh Festivals)
আগস্ট মাসে এডিনবরা বিশ্বের ‘উৎসবের রাজধানী’ হয়ে ওঠে। এ সময় একসঙ্গে কয়েক ডজন উৎসব হয়:
এডিনবরা ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল – অপেরা, থিয়েটার ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
এডিনবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যাল – বিশ্বের বৃহত্তম পারফর্মিং আর্টস ফেস্টিভ্যাল (যেকোনো রাস্তায়, যেকোনো জায়গায় নাটক, কমেডি, সংগীত)
মিলিটারি ট্যাটু – এডিনবরা ক্যাসলের সামনে স্কটিশ ব্যাগপাইপ ও সামরিক কুচকাওয়াজ
টিপস: আগস্টে এডিনবরা অতিমাত্রায় crowded থাকে। থাকার জায়গা ও টিকিট ৬ মাস আগেই বুকিং দিতে হবে।
৯. ক্যালটন হিল (Calton Hill) – সেরা সূর্যাস্ত দৃশ্য
ক্যালটন হিল এডিনবরার আরেকটি বিখ্যাত পাহাড়। আর্থার’স সিটের মতো কষ্ট করে উঠতে হয় না – সহজেই হেঁটে ওঠা যায়।
দর্শনীয় স্থাপনা:
ন্যাশনাল মনুমেন্ট – এথেন্সের পার্থেনন মন্দিরের আদলে তৈরি অসমাপ্ত স্থাপনা
নেলসন মনুমেন্ট – নেলসন অ্যাডমিরালের স্মৃতিস্তম্ভ
সিটি অবিসারভেটরি – পুরনো জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্র
রাতে আলো জ্বললে ক্যালটন হিলের দৃশ্য মন্ত্রমুগ্ধকর।
১০. ডিন ভিলেজ (Dean Village) – শহরের মাঝে শান্ত গ্রাম
ব্যস্ত এডিনবরা শহরের ঠিক মাঝখানে ডিন ভিলেজ এক টুকরো শান্ত স্বর্গ। লিথ নদীর পাড়ে অবস্থিত এই গ্রামটি ১৯শ শতাব্দীতে ময়দার কলির জন্য বিখ্যাত ছিল।
এখানে যা পাবেন:
পাথরের তৈরি পুরনো কলের বাড়ি
ছোট ছোট সেতু ও ঝরনা
ইন্সটাগ্রামের জন্য অসাধারণ ফটোস্পট
টিপস: প্রিন্সেস স্ট্রিট গার্ডেন্স থেকে হেঁটে মাত্র ১০ মিনিট দূরত্ব।
ভ্রমণের সময়সূচী (ইটিনেরারি)
| দিন | করণীয় |
|---|---|
| দিন ১ | সকালে এডিনবরা ক্যাসল → দুপুরে রয়েল মাইল (সেন্ট জাইলস, মেরি কিং’স ক্লোজ) → বিকেলে স্কটিশ ন্যাশনাল গ্যালারি → সন্ধ্যায় ক্যালটন হিল (সূর্যাস্ত) |
| দিন ২ | সকালে হোলিরুড প্যালেস → আর্থার’স সিট ট্রেক → দুপুরে ডিন ভিলেজ ও প্রিন্সেস স্ট্রিট গার্ডেন্স → বিকেলে এডিনবরা চিড়িয়াখানা |

0 মন্তব্যসমূহ